সুজন খান :
ঢাকার দোহার উপজেলার শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়া বাজারের হাট। যা প্রতি বৃহস্পতিবার কাকডাকা ভোর থেকে শুরু হয়ে রাত প্রায় ১০ টা পর্যন্ত জয়পাড়া বাজারে এই হাট বসে। বহু বছর পূর্বে এ হাটের নামকরণ ছিলো দেবীনগর হাট। তবে কালের পরিক্রমায় তা পরিবর্তন হয়ে এখন সর্বত্রই পরিচিতি পেয়েছে জয়পাড়া হাট নামে।
ঢাকার দক্ষিণে যতগুলো হাট বাজার রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম ও বিশাল জায়গা জুড়ে বিস্তীর্ণ জয়পাড়া বাজারের এই হাট। এই হাটে স্থানীয় ব্যবসায়ীরাসহ দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ব্যবসায়ী ও ক্রেতারা মালামাল ক্রয় ও বিক্রয় করতে আসেন এই হাটে। এই জয়পাড়া হাটের ভেতরে মুসল্লিদের পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ার জন্য রয়েছে টাইলস করা সুন্দর চকচকে একটি লম্বা মিনারসহ ৪ তলা বিশিষ্ট মাদ্রাসাসহ একটি মসজিদ। যা ইতোমধ্যেই নজর কেড়েছে এই হাটে আসা সকল শ্রেণী পেশার মানুষের।
বৃহস্পতিবার (৫ ডিসেম্বর) সকালে সরেজমিন ঘুরে দেখা যায়, শত বছরের ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়া বাজারের এই হাটে প্রচুর ব্যবসায়ী ও ক্রেতাদের রয়েছে উপচে পড়া ভীড়। কি নেই এই হাটে ? মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যা প্রয়োজন তা এমন কোন জিনিস নেই যা এই ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়া হাটে না পাওয়া যায়। এই হাটের একেক দিকে একেক ধরণের প্রয়োজনীয় জিনিসের পড়সা সাজিয়ে বসেছেন ব্যবসায়ীরা।
এই ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়া হাটে স্থানীয় দোহারের ব্যবসায়ীরা ছাড়াও নবাবগঞ্জ ও কেরাণীগঞ্জ উপজেলাসহ মুন্সিগঞ্জ, শ্রীনগর, সিরাজদিখান, মানিকগঞ্জ এবং ফুরিদপুর জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে এই হাটে ব্যবসায়ীরা আসেন মালামাল ক্রয় ও বিক্রয় করার জন্য। এই হাটে প্রত্যেকটি জিনিস ক্রয় বিক্রয়ে যেন প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। প্রত্যেকটি মালামাল কার আগে কে বিক্রি করে দ্রæত লাভবান হয়ে বাড়িতে ফিরতে পারেন এমন প্রতিযোগিতায় মত্ব হয়ে থাকেন ব্যবসায়ীরা।
ঐতিহ্যবাহী এই জয়পাড়া হাটে পাওয়া যায় দোহারের তাঁত শিল্পের হাতে বুনানো ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়ার লুঙ্গি। যা সারাদেশ ব্যাপি ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। বর্তমানে এ লুঙ্গির চাহিদা দেশ ছাপিয়ে বিদেশেও কদর রয়েছে বেশ। এছাড়াও এই এতিহ্যবাহী জয়পাড়া হাটে পাওয়া যায় দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনীয় জিনিসের মধ্যে রয়েছে বড় বড় ইলিশ, রুই, কাতলা ও সমুদ্রের বিভিন্ন জাতের শুটকি মাছসহ নানা জাতের মাছ।
এছাড়াও গরু ও ছাগলের মাংস, রাজ হাঁসসহ বিভিন্ন জাতে হাঁস-মুরগীর, আকর্ষণীয় বিভিন্ন সুন্দর প্রজাতির কবুতর, রং বেরংঙ্গের নানা প্রজাতের পাখি, গরু ও বিভিন্ন জাতের ছাগল, শ^াকসব্জি, আলু-পেয়াজসহ বিভিন্ন কাঁচা বাজার, বিভিন্ন রকমের ফলের বাজার, ধান-চাল-গমসহ নানা ধরনের দানাদার খাদ্য, সোনালী আশঁ পাট, বাচ্চা থেকে শুরু করে বড়দের কাপড়, মুড়ি, বিভিন্ন রকমের সুস্বাদু বিস্কুট, কাঠের তৈরি বিভিন্ন আসবাবপত্র, বাঁশের তৈরি নানা ধরণে জিনিসপত্র, জেলেদের মাছ ধরার জালসহ বিভিন্ন উপকরণ, কামাড়রা সাজিয়ে রেখেছেন দা, বুটি, কাঁচিসহ বিভিন্ন লোহার জিনিস, কুমাড়রা সাজিয়ে রেখেছেন মাটির তৈরি বিভিন্ন জিনিসপত্র, রয়েছে নানা ধরনের প্লাস্টিক ও থালা-বাটিসহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র।
আরও রয়েছে ঘর-বাড়ি সাজানের জন্য নানা ধরণের আর্কষনীয় ফর্নিচারের শোরুম, নিমটি, চানাচুর, মিষ্টি, বিভিন্ন জাতের ফুল ও ফলের গাছ-গাছালিসহ কি নেই এই হাটে। এক কথায় মানুষের ব্যবহারের বা মানুষের বেচে থাকার প্রয়োজনীয় সকল উপকরণই পাওয়া যায় ঐতিহ্যবাহী জয়পাড়া বাজারের এই হাটে।
লুঙ্গি বিক্রেতা মোজাহার আলী জানান, এই হাটটি শত বছরের পুরাতন একটি হাট। আমার বাপ-দাদারা এই হাটে জয়পাড়ার বিখ্যাত লুঙ্গি বিক্রি করতো। আমরাও এখানে লুঙ্গি বিক্রি করি। বাংলাদেশের বিখ্যাত ও নামকরা আমাদের জয়পাড়ার লুঙ্গি। সারা দেশে আমাদের এই লুঙ্গির ব্যাপক সুনাম রয়েছে। তাই অনেক দূর-দূরান্ত থেকে কাস্টোমাররা এখানে এই বিখ্যাত লুঙ্গি কিনতে আসে।
মানিকগঞ্জের বলড়া থেকে বিস্কুট বিক্রি করতে আসা ব্যবসায়ী জানান, এ হাটটি অনেক পুরাতন একটি হাট। এখানে বেচাকেনা অনেক বেশি, রাস্তাঘাট ভাল, জিনিসপত্রের দামও পাওয়া যায় অনেক।
জয়পাড়া হাটে জিনিসপত্র ক্রয় করতে আসা আব্দুল কালাম নামের এক ক্রেতা বলেন, আমার বাপ দাদার কালে থেকে এই হাট থেকে সংসারের যাবতীয় সব কিছু ক্রয় করি। এটা একটি অনেক পুরাতন একটি হাট। বহু বছুর আগে এই হাটের নাম ছিল দেবীনগর হাট। বর্তমানে এটাকে সবাই জয়পাড়া হাট নামেই চিনে। এই হাটে প্রয়োজনীয় সবই পাওয়া যায়।
ফরিদপুর থেকে ছাগল বিক্রি করতে আসা মোঃ আকবর নামে এক ব্যবসায়ী বলেন, আমরা ফরিদপুর থেকে ছাগল বিক্রি করতে আসছি। এখানে ছাগল বেচাকেনায় ভাল দাম পাওয়া যায়। এই হাটে আসতে যাতায়াতেও অনেক সুভিধা রয়েছে।